আন্তর্জাতিক বাজারে পাম অয়েলের দাম কমার পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি দেশের বাজারেও সমন্বয় করে সরকার। ঘোষণা দিয়ে খোলা পাম অয়েলের দাম লিটারপ্রতি ১৯ টাকা কমানো হয়। কিন্তু দাম কমানোর পর থেকেই ফের পাইকারি বাজারে অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে পণ্যটির দাম। এক সপ্তাহের ব্যবধানে লিটারপ্রতি পাম অয়েলের দাম বেড়েছে প্রায় ৪ টাকা। আর এক মাসের ব্যবধানে মণপ্রতি এর দাম বেড়েছে ৩০০ টাকা। ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানগুলো এসও (সাপ্লাই অর্ডার) সরবরাহ কমিয়ে দেয়ায় পাইকারি বাজারে পাম অয়েলের দাম বেড়েছে বলে অভিযোগ সাধারণ ব্যবসায়ীদের।
জানা গেছে, গত ১২ আগস্ট বিশ্ববাজারের তথ্য পর্যালোচনা করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে পাম অয়েলের লিটারপ্রতি দাম ১৯ টাকা কমিয়ে ১৫০ টাকা নির্ধারণ করে। দীর্ঘদিন ধরে এ ভোজ্যতেলের নির্ধারিত বাড়তি দামের কারণে পাইকারি বাজার নিম্নমুখী থাকলেও খোলাবাজার থেকে ভোক্তাদের বাড়তি দামে পাম অয়েল কিনতে হচ্ছিল। সরকারিভাবে দাম কমানোর পর পাইকারি বাজারে দর বৃদ্ধিতে মুষ্টিমেয় কয়েকটি ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানের কারসাজি রয়েছে বলে দাবি করছেন পাইকারি ব্যবসায়ীরা। আমদানিকারকদের সঙ্গে আলোচনা করে দাম কমানো হলেও পাইকারি বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় সরকারি দাম নির্ধারণকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
দেশে ভোগ্যপণ্যের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শনিবার প্রতি মণ (৩৭ দশমিক ৩২ কেজি) পাম অয়েলের লেনদেন হয়েছে ৫ হাজার ৯৮০ থেকে সর্বোচ্চ ৬ হাজার টাকায়। পণ্যটি দীর্ঘদিন ধরে ৫ হাজার ৬৮০ থেকে ৫ হাজার ৭০০ টাকার মধ্যে লেনদেন হচ্ছিল। কিন্তু গত এক মাস আগে পণ্যটির দাম ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করে। সর্বশেষ এক সপ্তাহ আগেও মণপ্রতি পাম অয়েলের দাম ছিল ৫ হাজার ৮৪০ থেকে ৫ হাজার ৮৫০ টাকা। এক সপ্তাহের ব্যবধানে পাম অয়েলের এসও পর্যায়ে পাইকারি দাম প্রায় ১৫০ টাকা বেড়ে প্রায় ৬ হাজার টাকায় লেনদেন হয়েছে। এ হিসাবে এক মাসের ব্যবধানে মণপ্রতি পাম অয়েলের দাম বেড়েছে প্রায় ৩০০ টাকা।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ পাইকারি ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি গোলাম মওলা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে দেশে ভোজ্যতেলের দাম বাড়তি। পাম অয়েলের আন্তর্জাতিক দাম কমে যাওয়ায় দেশের বাজারেও সমন্বয় করা হয়েছে। কিন্তু দাম কমানোর পর মিল গেটে সরবরাহ কমিয়ে দেয়ার পাশাপাশি ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানগুলো দাম বাড়িয়ে বিক্রি করছে।’
ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশে পাইকারি বাজারে ভোজ্যতেলের দাম নির্ধারণ হয় মূলত ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তে। ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানগুলো আগেই ব্যবসায়ীদের কাছে এসও বিক্রি করে। আমদানিকারকদের কাছ থেকে নেয়া এসব এসও এক পর্যায়ে কিনতে শুরু করে ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানগুলো। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন করে খোলাবাজার (পাইকারি বাজার) থেকে এসও ক্রয় বা সংগ্রহ শুরু করলে পণ্যের বাজার কৃত্রিমভাবে বেড়ে যায়। গত এক সপ্তাহ বিশ্ববাজারে বুকিং বেড়ে যাওয়ার অজুহাতে পাম, সয়াবিন, সুপার পাম অয়েলসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম কিছুটা বেড়েছে। কিন্তু হঠাৎ করে বাড়তি ক্রয়াদেশের কারণে ভোজ্যতেলের দাম কয়েক দিনের ব্যবধানে মণপ্রতি ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে।
পাইকারি বাজার সূত্রে জানা গেছে, শনিবার প্রতি মণ সয়াবিন আগের চেয়েও ১০০ টাকা বেশি দামে মণপ্রতি ৬ হাজার ৫০০ টাকায় লেনদেন হয়েছে। এছাড়া সুপার পাম অয়েল লেনদেন হয়েছে ৬ হাজার ১০০ টাকা দামে। বিশ্ববাজারে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ না বাড়লেও শুধু সরবরাহ সংকট ও মিলগেটে পণ্য সংগ্রহের বিলম্বে পাম অয়েলের দাম অস্বাভাবিক বেড়েছে। পাম অয়েলের দাম বেড়ে যাওয়ায় এ সময়ে সয়াবিনের দামও বেড়েছে মণে ১০০ টাকা।
বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত পাম অয়েল ও সয়াবিনের বুকিং দামের চিত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সর্বশেষ জুলাইয়ে বিশ্ববাজারে পাম অয়েলের বুকিং দাম ছিল টনপ্রতি ৯৭৫ ডলার। এছাড়া জুলাইয়ে টনপ্রতি দাম ছিল ৯৩৫ ডলার এবং মে মাসে অপরিশোধিত পাম অয়েলের বুকিং দাম ছিল ৯০৮ ডলার। অপরদিকে মে মাসে সয়াবিনের বুকিং দাম ছিল টনপ্রতি ১ হাজার ১৬৩ ডলার, জুনে ১ হাজার ১৭৮ ডলার এবং জুলাইয়ে অপরিশোধিত সয়াবিনের বুকিং দাম ছিল ১ হাজার ৩০৭ ডলার। জুন থেকে জুলাইয়ের মধ্যে সয়াবিনের দাম টনপ্রতি ১২৯ ডলার বাড়লেও পাম অয়েলের দাম বেড়েছে টনপ্রতি মাত্র ৪০ ডলার।
খাতুনগঞ্জের ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিশ্ববাজারে পাম অয়েলের বুকিং বেড়েছে সামান্য। কিন্তু গত এক সপ্তাহেই পাইকারি বাজারে মণপ্রতি পাম অয়েলের দাম বেড়েছে মণপ্রতি ১৫০ টাকারও বেশি। বর্তমানে বিক্রি হওয়া পাম অয়েল অন্তত এক মাস আগে আমদানি করা। ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন আগে সংগ্রহ করা এসও বাড়তি দামে বিক্রি শুরু করায় পাইকারি বাজারে পাম অয়েলসহ বিভিন্ন ভোজ্যতেলের দাম বাড়ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে বিক্রি হওয়া ভোজ্যতেলের সিংহভাগই পাম অয়েল। বোতলজাত সয়াবিনের বিপরীতে খোলাবাজারে বিক্রি হওয়া পাম অয়েলের সরকারি দাম নির্ধারণ হলেও সেটি কখনই বাস্তবায়ন হয় না। বোতলজাত সয়াবিনের মোড়কের গায়ে দাম লেখা থাকলেও পাম অয়েলের দাম লেখার সুযোগ নেই। যার কারণে সরকারিভাবে দাম নির্ধারণ হলেও সেটি মেনে চলে না কেউই। মিল মালিক, আমদানিকারক ও ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারি দাম মেনে না চললে দেশে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া ভোজ্যতেল পাম অয়েলের বাজার নিয়ে কারসাজি কমবে না বলে জানিয়েছেন সাধারণ ব্যবসায়ীরা।